07, February, 2023
Home » বিশ্বকাপ এবং কাতার

বিশ্বকাপ এবং কাতার

এক যুগ অপেক্ষার আর চার ঘন্টা বাকী! এর পরেই শুরু হচ্ছে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’- কাতারে বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান! সারা বিশ্বের চোখ থাকবে ঐদিকে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। জনগন আন্দোলন, সংগ্রাম, মহাসমাবেশ, ধর্মঘট, সরকারী বাধা, ধরপাকড় ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও বিশ্বকাপ নিয়ে প্রায় সবারই একটা আলাদা আগ্রহ আছে। হয়ত কেউই মিস করবে না উদ্বোধন, সুযোগ সুবিধামত প্রিয় দলের খেলা দেখতেও ভুল করবে না।
৯২ বছর ধরে চলা বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রতিটি আসরেই সংযোজন হয়েছে নতুন নতুন কিছু। কাতারেও তার ব্যতিক্রম হবে না। তবে এবারের বিশ্বকাপে যেন ‘নতুনের মেলা’ বসেছে। আরববিশ্বে আয়োজিত প্রথম বিশ্বকাপে দেখা মিলবে এমন অনেক কিছুর, যা আগের কোনো আসরে দেখা যায়নি। চেনা মোড়কের বিশ্বকাপে এবারে যেসব নতুনত্ব থাকছে:
#এই প্রথম শীতকালে বিশ্বকাপ আয়োজন, প্রায় সবাই বলছে মজার হবে!
#তপ্ত বালুর মধ্যপ্রাচ্যে এই প্রথম বিশ্বকাপ!
#সব থেকে বেশি খরচ- ২২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
#সব থেকে উচ্চ টিকেট মূল্য: প্রতি টিকেট ২৮৬ পাউন্ড, আর ফাইনালের টিকিটের দাম পৌঁছেছে ৮১২ ডলারে। এটি গত রাশিয়া বিশ্বকাপ ফাইনালের চেয়ে ৫৯ শতাংশ বেশি।
#হাই প্রাইজমানি: সব মিলিয়ে তিন হাজার কোটি টাকার প্রাইজমানি দেয়া হবে, শেষ ষোলোর আট দলের প্রত্যেকে পাবে ১১.৭ মিলিয়ন ইউরো করে। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয়া চার দল পাবে ১৫.৪০ মিলিয়ন ইউরো, তৃতীয় ও চতুর্থ হওয়া দল পাবে প্রায় ২৬০ কোটি টাকা ও ২৪০ কোটি টাকা। রানার্স আপ দল পাবে ২৭.২৭ মিলিয়ন ইউরো। আর শিরোপা জয়ী দল পাবে ৩৮ মিলিয়ন ইউরো।
#প্রথম টেকনো বল, যা অ্যাডিডাসের তৈরি, নাম ‘আল রিহলা’। চামড়ায় তৈরি বলটির ভেতরে ৫০০ হার্জ আইএমইউ সেন্সর প্রযুক্তি থাকবে, যার পাঠানো তথ্য ব্যবহার করে নিখুঁত সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)।
#প্রথম সেমি-অটো অফসাইড প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে এবার। প্রতিটি স্টেডিয়ামের ছাদের নিচের অংশে ১২টি ট্র্যাকিং ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, যাতে অফসাইড হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও ম্যাচ অফিশিয়ালদের কাছে অফসাইড সংকেত চলে যাবে।
#ফুটবলারদের জন্য ডেটা অ্যাপ থাকবে, যাতে ৩২টি দলের ফুটবলারদের পারফরম্যান্সের আরও বিশ্লেষণী ও নিখুঁত তথ্য পাওয়া যাবে। ডেটার মধ্যে থাকবে ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ কোন মুহূর্তে তিনি কেমন খেলেছেন, বল পায়ে কেমন ছিলেন, কতটুকু কী প্রচেষ্টা ছিল ইত্যাদি।
#প্রথম ‘অল গ্রিন’ যানবাহন ব্যবস্থা চালু করেছে কাতার।
#প্রথম ‘টাইট’ বিশ্বকাপ। মাত্র ৫৫ কিলোমিটারের মধ্যে আটটি স্টেডিয়ামে খেলা হবে। ভৌগোলিকভাবে এটিই সবচেয়ে ‘আঁটসাঁট’ জায়গার বিশ্বকাপ।
#প্রথম নারী রেফারি থাকছে কাতারে। ৬৪টি ম্যাচের জন্য মোট ৩৬ জন প্রধান রেফারির মধ্যে নারী আছেন তিনজন।
এসব নানা কারণে কাতার বিশ্বকাপ বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে খেলা চলাকালে আগত লাখ লাখ অতিথিদের সামনে ইসলামের শিক্ষা ও পরিচিতি তুলে ধরারা সুযোগ হাতছাড়া করেনি দেশটি। ইসলাম প্রচারের পুরো প্রকল্পটি দেখভাল করছে কাতারের আওকাফ ও ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ উপলক্ষে দেশটি একটি বিশেষ প্যাভিলিয়ন চালু করেছে। প্যাভিলিয়নে বিভিন্ন ভাষায় মুদ্রিত ইসলাম ও আরব সংস্কৃতির পরিচিতিমূলক বই বিতরণ করা হবে। দর্শকদের সাথে তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলার জন্য থাকবেন সেই ভাষার দাঈ বা ইসলাম প্রচারক। বিশেষত উপসাগরীয় দেশ কাতারের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরা হবে দর্শনার্থীদের কাছে। এতে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি বা ভিআর প্রযুক্তির সাহায্যে দেখানো হবে পবিত্র কাবাঘর, হাজরে আসওয়াদসহ মক্কা ও মদিনার ঐতিহাসিক ইসলামী স্থাপনা। রাজধানী দোহাসহ বিভিন্ন স্থানে সাঁটানো হয়েছে মহানবী (সা.)-এর হাদিস সম্বলিত ম্যুরাল। সামাজিক শিষ্টাচার নিয়ে মহানবী (সা:)এর প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণীগুলো লেখা হয়েছে আরবি ও ইংরেজি ভাষায়। অর্থপূর্ণ হাদিসগুলো চলার পথে দর্শক ও পাঠকদের মনে তৈরি করবে ভিন্নরকম অনুভূতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ছবি ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে। কাতারের অভিনব এই আয়োজনের প্রশংসা করেছেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলার্সের মহাসচিব ড. আলী আল-কারাহ দাগি।
কাতারের এই ইসলাম প্রচারের অন্যতম আকর্ষণ হলো শ্রেষ্ঠ বক্তা ডা. জাকির নায়েক! ইসলাম ধর্মের বাণী প্রচার করতে মালয়েশিয়া থেকে দাওয়াত করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে নিজদেশ ভারতে নিষিদ্ধ ইসলামের দা’য়ি জাকির নায়েককে। প্রতিদিন তাঁর ইসলামি আলোচনা চলবে কাতারজুড়ে। অথচ সেকেন্ড লার্গজেস্ট মুসলিম কান্ট্রি দাবীদার বাংলাদেশে তিনি নিষিদ্ধ! ইতোমধ্যে কাতারে ৫৫ জন ভিনধর্মের মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আগমন করেছেন।
বাংলাদেশ এবং কাতারের বয়স প্রায় একই। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা, আর কাতার ১ সেপ্টেম্বর! কাতারের চেয়ে বাংলাদেশের আয়তন হাজার গুণ বেশি। কাতারের জনসংখ্যা মাত্র ২৯ লাখ, যার ১০ ভাগ বাংলাদেশী। শুধু রাজধানী দোহাতে কাজ করে বাংলাদেশের কয়েক লাখ প্রবাসী। কাতারে তেমন কোনো ফসল হয়না, মরুভূমির বালি আর গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়া একটি দেশ। এর মূল সম্পদ মাটির তলায় তেল হলেও এখন উত্তোলন প্রায় বন্ধ! মধ্যপ্রাচ্যের এই ছোট্ট দেশটি এবার বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন করতে গিয়ে কি কি করলো, জানা যাক:
১) আমেরিকার মতো পরাশক্তিকে লবিয়িংয়ে হারিয়ে ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক হয় কাতার।
২) আয়োজনের ঘোষণার পরে সবার একটাই প্রশ্ন, মরুভূমির তপ্ত বালির দেশে কিভাবে বিশ্বকাপ হতে পারে? কিন্তু কাতার আলোচনা করে গরম কালের বিশ্বকাপ নিয়ে গেলো শীতকালে!
৩) কাতারে তেমন কোনো আধুনিক স্টেডিয়াম ছিলো না! যে দুটি স্টেডিয়াম ছিল তা সংস্কার করে আধুনিকায়ন করে। আরও নির্মান করলো নতুন ছ’টি স্টেডিয়াম, যা বিশ্বের লেটেস্ট সুযোগ সুবিধাসম্পন্ন, এবং সবগুলো স্টেডিয়ামই ফুল এয়ার কন্ডিশন্ড। পুরো দোহাজুড়ে আধুনিক উপায়ে গাছ লাগানো হয়েছে।
৪) মাত্র এগার হাজার বর্গকিলোমিটারের ছোট্ট দেশটিতে আধুনিক হোটেল ছিলো হাতে গোনা। অথচ এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১২ লাখের বেশি মানুষ কাতার যাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব ভ্রমণকারীর রাতযাপনের জন্য অত্যাধুনিক হোটেলের পাশাপাশি অত্যাধুনিক সুবিধাযুক্ত অ্যাপার্টমেন্ট, ভাসমান হোটেল, ভিলা, ফ্যান ভিলেজ, এমনকি মরুভূমিতে তৈরি করা হয়েছে কয়েক হাজার ফাইভ স্টার টেন্ট। দোহা বন্দরে পৌঁছায় ২২তলার ‘ভাসমান হোটেল’, আরও বহু নৌতরীতে অবস্থান করবে মেহমানরা। এগুলো ভাসমান হোটেল। সব মিলিয়ে আবাসন সমস্যা মিটিয়ে ফেলেছে কাতার।
৫) বিশ্বকাপ উপলক্ষে কাতার ‘অল গ্রিন’ যানবাহন ব্যবস্থা চালু করেছে! কার্বন-নিসরণ বিহীন বিশ্বকাপ আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিল কাতারের সুপ্রিম কমিটি ফর ডেলিভারি অ্যান্ড লিগ্যাসি। এ জন্য যাতায়াতে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাসের ব্যবস্থা করেছে কর্তৃপক্ষ। ইলেকট্রিক বাসগুলো ৪৪টি মেট্রোলিংক এবং ৪৮টি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট রুটে চালানো হবে। আয়োজক কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, বিশ্বকাপের মাধ্যমে চালু হওয়া পরিবেশবান্ধব যানবাহন ব্যবস্থা কাতারের যাতায়াত ব্যবস্থায় টেকসই হবে। ইতোমধ্যেই কাতারের সব ট্রান্সপোর্ট ফৃ করে দিয়েছে দেশটি!
৬) বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে লুসাইল স্টোডিয়ামে। এর জন্য তারা পুরো একটা শহর তৈরী করে ফেলে। শহরের নাম লুসাইল সিটি, যাকে ফিউচার দুবাই বলা হচ্ছে।
৭) বিশ্বকাপের ছ’মাস আগেই কাতার ফিফাকে সরাসরি জানিয়ে দেয় মদ, সমকামিতা কোনোটাই চলবে না, এমনকি স্বল্পবসনা তরুনিরাও ঢুকতে পারবে না। কাতার জানায়, আমরা ১ মাসের জন্য নিজেদের ধর্ম পরিবর্তন করবো না। অবশেষে ফিফা সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়। ফলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান থেকে বাদ পরে শাকিরা সহ বহু স্বল্পবসনা ললনার!
৮) বিশ্বকাপের ১০০ দিন আগে কাতার ঘোষণা করে, ইসরায়েলের নাগরিকরা খেলা দেখতে চাইলে ফিলিস্তিনের পাসপোর্ট নিয়ে আসতে হবে।
৯) ফিফার কাছে যে পরিকল্পনা কাতার দিয়েছিল তাতে বলা হয়েছে শুধু ফুটবলের অবকাঠামো নির্মাণে ৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করবে তারা। কিন্তু আদতে খরচ করেছে ৬.৫ বিলিয়ন থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার। ইউএস স্পোর্টস ফাইন্যান্স কনসালটেন্সি ফ্রন্ট অফিস স্পোর্টসের মতে, বাকি প্রায় ২১০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে বিমানবন্দর, নতুন রাস্তা, হোটেলসহ উদ্ভাবনী হাব এবং অত্যাধুনিক পাতাল পরিবহনের উন্নয়নে। শুধু দোহাতেই, ‘দ্য পার্ল’ নামে আবাসন কমপ্লেক্সে ১৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করা হয়েছে এবং দোহা মেট্রোতে খরচ হয়েছে ৩৬ বিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে আগেকার আসরের বহগুণ খর্চা করেছে কাতার। বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য ২০১৮ সালে রাশিয়া খর্চ করেছিল ১১.৬ বিলিয়ন, ব্রাজিল ২০১৪ সালে করেছিল ১৫ বিলিয়ন ডলার, ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা খরচ ছিল ৩.৬ বিলিয়ন ডলার, এই রকম। মোট কথা, গত ১০টি বিশ্বকাপের মোট খরচের যোগফলের চাইতেই বেশি খরচ করেছে কাতার।
কাতারের কোষাগারে রয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। তাই ফুটবল বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ আয়োজনে ভয় পায়নি ৩৪ বছর বয়সী আমির শেখ তামিম। ২০১০ সালে ফিফার থেকে আয়োজক স্বত্ত্ব পাওয়ার পরই কাতার ঘোষণা দেয়, বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেবেন তারা। কথা মতো কাজ তাদের। তাদের মেরুদন্ড আছে, আর আছে ইসলামিক শাসন ব্যবস্থার মানদণ্ড! ১১ হাজার বর্গকিলোমিটারের ছোট্ট দেশ কাতার বিশ্বকে বুঝিয়ে দিলো, সঠিক লিডারশীপ একটা দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে!
Picture from @archdaily

Leave a Comment

You may also like

Critically acclaimed for the highest standards of professionalism, integrity, and ethical journalism. Ajkerkotha.com, a new-generation multimedia online news portal, disseminates round-the-clock news in Bangla from highly interactive platforms.

Contact us

Copyright 2021- Designed and Developed by Xendekweb