06, October, 2022
Home » বাংলাদেশ শুধু পাকিস্তান-শ্রীলংকা হবে কেন?

বাংলাদেশ শুধু পাকিস্তান-শ্রীলংকা হবে কেন?

আবু রুশদের কলাম

একটা কথা কি কেউ কখনো ভেবে দেখেছেন যে সম্প্রতিক পৃথিবীতে যখন এতদঞ্চলের কয়েকটি দেশ বিপদে পড়েছে অর্থনৈতিকভাবে, কিন্তু ঠিক আশপাশের অনেকগুলো দেশ দীর্ঘ আড়াই বছর মহামারী মোকাবেলার পরও অর্থনীতিকে বেশ ভালোভাবেই সামাল দিয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের কথা বলি। ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম তো আমাদের আশপাশেরই দেশ। আমি নিজে গত ২৩ জুলাই থেকে এক সপ্তাহের জন্য মালয়েশিয়া সফর করি। সেখানে টুরিস্ট কম, কিন্তু মালয়েশিয়াতে অর্থনৈতিক চাকা কিন্তু ঠিকই সচল।

ইন্দোনেশিয়ার কথায় আসুন। বিশাল একটি দেশ যার জনসংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে বেশ বেশি। সেই দেশটিতে করোনা মহামারী ছোবল মেরেছিল অনেক ভয়াবহভাবে। কিন্তু চীন থেকে অনেক পশ্চিমা শিল্প, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে অনেক প্রযুক্তি ইন্দোনেশিয়ায় এর মাঝেই চলে গেছে। আজ ঢাকাতে বড় শো-রুমগুলোতে যদি ওভেন, ওয়াশিং মেশিন, এয়ারকন্ডিশনার, রেফ্রিজারেটর, টেলিভিশন কিনতে যান তাহলে দেখবেন জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত ব্রান্ডগুলো যেমন শার্প, জেনারেল, হিটাচি, প্যানাসনিকের পণ্য গুলো হয় ইন্দোনেশিয়া অথবা মালয়েশিয়ার তৈরি।

এসব দেশে কেন ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন ও কোভিড মহামারী পরবর্তী অর্থনৈতিক ঝড় ঠিকমতো আঘাত হানতে পারল না? অন্যদিকে পাকিস্তান, শ্রীলংকা, বাংলাদেশ, নেপাল ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক নৈরাজ্যের মধ্যে পড়লো। কেন?

ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভারত , এমনকি কমিউনিস্ট ভিয়েতনাম অর্থনীতিকে সুন্দরভাবে ম্যানেজ করেছে। তাদের জ্বালানি সংকট নেই। ভারত ছাড়া অন্য দেশগুলোয় তাদের কারেন্সির মান ডলারের বিপরীতে খুব একটা হেরফের হয়নি। কারো মনে কি এই প্রশ্নগুলো বা জিজ্ঞাসা জাগে?

কমিউনিস্ট ভিয়েতনাম যেই আমেরিকার বিরুদ্ধে বছরের পর বছর যুদ্ধ করেছে সেই আমেরিকা ও পশ্চিমের সহযোগিতায় তারা আজ স্যামসাংয়ের মতো বিখ্যাত স্মার্টফোন ও অন্যান্য সব দামি ব্রান্ডের ইলেকট্রনিক্স তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ভিয়েতনামের দানাং বন্দরে আমেরিকার তিনটি নৌ জাহাজ সব সময় অবস্থান করে। কই তাতে তো ভিয়েতনামের স্বাধীনতার চেতনা ভূলুণ্ঠিত হয় নি বা আদর্শ হারিয়ে যায় নি। তাদের বাঘা বাঘা কমিউনিস্ট নেতারা সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র বলে চিৎকার, চেঁচামেচি করেনি।বরং ভিয়েতনাম আমেরিকার সহযোগিতায় চীনের মত শত্রু ভাবাপন্ন বিশাল দেশকে ঠেকিয়ে রেখেছে সাফল্যের সাথে। তাদের জাতীয় নিরাপত্তাও সুসংগঠিত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, কলকারখানা, রপ্তানি সব ঠিকমত চলছে। তাদেরও জ্বালানি সংকট নেই!
ইন্দোনেশিয়া আর পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে একটি অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। অনেকের ভালো না লাগলেও বলছি যে কেবলমাত্র আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপানের মত দেশগুলো সহায়তায় ইন্দোনেশিয়া বড় বড় ব্রান্ড ও কোম্পানিগুলো তাদের দেশে নিয়ে আসতে পারছে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া জাপানের সাথে অত্যন্ত গভীর সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। একই সাথে আমেরিকা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সাথে সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। মালয়েশিয়াও ওই পথে হাঁটছে। সে দেশের সিলিকন ভ্যালী বলে পরিচিত সাইবার জায়াতে চীন থেকে প্রত্যাহার করে পশ্চিমা দেশগুলো অত্যাধুনিক চিপস, সেমিকন্ডাক্টর সহ জটিল আইটি সংক্রান্ত প্রযুক্তি নিয়ে আসছে। তুরস্ক গত সপ্তাহে মালয়েশিয়ার কাছ থেকে চিপস চেয়েছে সামরিক খাতে ব্যবহারের জন্য। কই মালয়েশিয়ার সার্বভৌমত্ব তো বিলীন হয়নি।
এখন পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা -এই দেশগুলোর দিকে তাকান। পাকিস্তান কোভিড মহামারীর মধ্যেও চীন থেকে সাড়ে তিনশ ভি টি ৪ অত্যাধুনিক ট্যাংক ও জে ১০ মাল্টি রোল জঙ্গি বিমান সংগ্রহ করেছে। স্টিলথ প্রযুক্তির ফ্রিগেট নিয়ে এসেছে। শ্রীলংকা হাম্বানটোটা সমুদ্র বন্দর তো বটেই বহু চটকদার ও বিশালাকৃতির প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, সমুদ্রের নিচ দিয়ে টানেল ইত্যাদি সব জাহাবাজ প্রকল্প নিয়ে গর্ব করেছে।
অস্বীকার করার উপায় নেই বাংলাদেশ আমেরিকার প্রায় ৮ কোটি টিকা পেয়ে মহামারী ভালোভাবেই সামাল দিতে পেরেছে। কিন্তু আজ বিশ্বে যখন জ্বালানি তেলের দাম কমছে তখন বাংলাদেশে কিভাবে দাম বাড়ানো হয়েছে তা সবাই দেখেছেন। বাংলাদেশ শ্রীলংকা নয়। তবে কোনোভাবেই বলা যাবে না বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে বা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দিক দিয়ে খুব একটা ভালো অবস্থানে আছে।
কেন এমন হচ্ছে? এই তিনটি দেশ চীনের একতরফা বিশালাকৃতির প্রকল্প ভিত্তিক ঋণ নিয়েছে। এসব ঋণ চড়া সুদের। এসব ঋণের মাধ্যমে তৈরি প্রকল্পগুলো নিয়ে অভিযোগ বিস্তর। কোন জবাবদিহিতা নেই। খরচ শুধু বেড়েছে এই প্রকল্পগুলোর। হাজার হাজার কোটি টাকা লুফে নিয়েছে নব্য সুবিধাবাদী অলিগার্ক শ্রেণী। অর্থ শুধু তাদের পকেটেই। এসবের আবার বেশিরভাগ বিদেশে পাচার হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে অর্থগুলো ঠিকমত বিলি বন্টন হয়নি। টেকসই উন্নয়ন বলতে যে কথাটি বোঝায় তা এই তিনটি দেশের একটিতেও অনুসরণ করা হয়নি।
কেউ যদি এই পার্থক্যটি না বোঝেন ও সেই পুরনো আমলের গৎবাধা কতগুলো কথা বলেন তাহলে কোনদিন সমস্যার সমাধান হবে না এবং আপনারাও সমস্যা থেকে বের হতে পারবেন না। আই এম এফ, বিশ্ব ব্যাংক বা পশ্চিমা কোন মাধ্যম থেকে পাওয়া ঋণ সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র বা দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয় এমন ধারণা নিয়ে আপনারা থাকতে পারেন। তাতে ১৯৫০ বা ১৯৬০ দশকের বস্তা পচা কতগুলো শব্দই শুধু শুনতে পারবেন। কোন লাভ হবে না।
কেউ কি অস্বীকার করতে পারেন যে জাপান বা আমেরিকার টাকা দিয়ে যেসব প্রকল্প হয় তা থেকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদী লম্পট শ্রেণী কোন চুরি করতে পারে বা ১০ টাকার প্রকল্পকে এক হাজার টাকা বানাতে পারে? না,পারে না।

এক দল লোক আছে যারা সেই পুরনো আমলের আবেগ আশ্রিত কথামালা ও সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের ভাব নিয়ে বলে থাকেন যে আমেরিকা যে দেশে হাত দেয় তা শেষ হয়ে যায়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইনস, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ব্রিটেন, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া- কোন দেশটি শেষ হয়েছে? বরং আমেরিকার ছত্রছায়া থাকার কারণে এই সব দেশগুলো সব সময় সামরিক খাতে ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় নিশ্চিন্ত থেকেছে। অপরদিকে অর্থনৈতিকভাবে পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। যে চীন নিয়ে এত বাহাদুরি সেই চীন কার প্রযুক্তি ও সক্রিয় সহযোগিতায় আজকের অবস্থানে এসেছে? ওই দেশে যেসব জিনিস তৈরি হয় সেগুলো কোন দেশের ব্রান্ড? চীনে পুঁজি বিনিয়োগ করেছিল কে বা কারা?

সস্তা আবেগ ছুড়ে দেয়া মানুষগুলোর বাইরে একটু চিন্তা করুন ও একটু মাথা খাটান। তাহলেই অনেক কিছু সহজ হয়ে যাবে।
পৃথিবী পাল্টাচ্ছে, খুব দ্রুত পাল্টাচ্ছে। আমরা যদি প্রাচীন যুগের ধ্যান ধারণা ও আবেগ নিয়ে বসে থাকি তবে রাজনীতিতে যেমন কখনো গণতন্ত্র আসবেনা ঠিক তেমনি অর্থনীতিতেও টেকসই উন্নয়ন হবে না

Leave a Comment

You may also like

Critically acclaimed for the highest standards of professionalism, integrity, and ethical journalism. Ajkerkotha.com, a new-generation multimedia online news portal, disseminates round-the-clock news in Bangla from highly interactive platforms.

Contact us

Copyright 2021- Designed and Developed by Xendekweb