07, February, 2023
Home » জেনারেল আকবর এবং জিয়াউল দেশ ছাড়ছেন!
ভাগছে

জেনারেল আকবর এবং জিয়াউল দেশ ছাড়ছেন!

রাষ্ট্রদূত হতে চান

ডিসেম্বর মাসে বর্তমান সরকারের পতনকে সামনে রেখে সরকারের সুবিধাভোগী এবং খুনিরা দেশ ছাড়া শুরু করেছে। ইতোমধ্যে সবচেয়ে জঘন্য মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত দুই সেনা কর্মকর্তা লে. জেনারেল আকবর হোসেন এবং মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান রাষ্ট্রদূত হিসাবে পোস্টিং নিয়ে দেশ ছাড়ার জন্য ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত হওয়ার জন্য সরকারের বিভিন্ন লেভেলে তদবীর চালাচ্ছেন।
লে. জেনারেল আকবর হোসেন :
সেনাবাহিনীর ১৩ লংয়ের আফিসার। শেখ হাসিনার অধীনে চার বছর ডিজি ডিজিএফআই থাকাকালে শত শত রাজনৈতিক অপহরন, গুম, হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িতে ছিলেন আকবর। এর আগে ডিজি ছিলেন স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের। ২০১৪ সালের বিনাভোটের নির্বাচনের সময় জাতীয় পাটি প্রধান জেনারেল এরশাদকে নির্বাচনে ধরে রাখতে কর্নেল জিয়াউল আহসান তুলে নিয়ে যায় ডিজিএফআই প্রধান এই আকবরের কাছে। কথা শুনাতে গিয়ে এক পর্যায়ে এক থাপ্পড়ে ফেলে দেয় এরশাদকে। তারপরে যা হবার তাই হয়: এরশাদকে সিএমএইচে আটকে রেখে নির্বাচন নাটক শেষ করা হয়। এরপরে আকবরকে বসানো হয় সাভারের নবম ডিভিশনের জিওসি। এখানে থাকতে প্রধান বিচারপতির সাথে সরকারের দ্বন্দ্ব লেগে গেলে এই আকবর পদের অপব্যবহার করে প্রধান বিচারপতির রুমে ঢুকে তাকে অপমান করে, মাথায় প্তিল ঠেকিয়ে পদত্যাগ পত্রে সই করিয়ে নেয়। এরকম বহু অপকর্মের মূল কুশিলব ছিলেন এই জেনারেল আকবর। তার চেয়ার এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে সিনেমা ও শোবিজজগতের বহু নারীর ইজ্জত লুটে নেন। দিনের বেশির ভাগ সময় থাকেন তিনি মাতাল। লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. আকবর হোসেন বর্তমানে বর্তমানে কমান্ড্যান্ট ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ (এনডিসি) পদে কর্মরত আছেন।
মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান:
ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত। সময় খারাপ, ডিসেম্বরে দেশে থাকতে চাননা জিয়াউল। তাই দেশ ছাড়তে চান। হাসিনার নিয়োগ করা সাবেত সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ সম্প্রতি প্রকাশ করেছিল, হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক সিদ্দিক হলো দেশের গুম খুনের অন্যতম হোতা। র্যা বের প্রাক্তন কর্মকর্তা মে. জে. জিয়াউল আহসান এবং মে. জে. জোবায়েরের মাধ্যমে গুম-খুন করিয়ে থাকেন, এবং এ সবকিছুই ’মাদার অব মাফিয়া’র জ্ঞাতসারে বা নির্দেশেই ঘটে থাকে। এনিয়ে এখন আর লুকোছাপার কিছু নাই, সবাই জানে।
যদিও জিয়াউল সহ র্যা বের অপরাপর খুনিদের মানবতাবিরোধী অপকর্ম সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘ ওয়াকিবহাল আছে, তদুপরি তার অপরাধের যেসব ফিরিস্তি রয়েছে:
১) বিএ-৪০৬০ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়াউল আহসান (জন্ম তারিখ ১ জানুয়ারি ১৯৭১) ২৪তম লংকোর্সে ১৯৯১ সালে (তখন বিএনপি ক্ষমতায়) পদাতিক শাখায় সেনাবাহিনীর চাকুরিতে যোগ দেন। ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর ২৭ আগস্ট লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানকে র্যিপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন- র্যা বে পরিচালক হিসাবে নিয়োগ করে। প্রথমে গোয়েন্দা শাখার পরিচালক এবং পরে ২০১৩ সালে হেফাজত নিধনের পুরষ্কার স্বরূপ পদোন্নতি দিয়ে সংস্থাটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক করা হয়। এসব পদে থেকে বিনাভোটের সরকারের ইচ্ছায় বিরোধী দল নিধনে ব্যাপক তৎপরতা চালান। শাপলা চত্তর ম্যাসাকারে তার কাজে খুশী হয়ে সরকার তাকে তিনটি পদোন্নতি দিয়ে কর্নেল, ব্রিগেডিয়ার, মেজর জেনারেল করে, এবং বহু পদক পুরষ্কার দেয়। বর্তমান পোস্টিং ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (NTMC) মহাপরিচালক, যাদের কাজ মুলত নাগরিকদের ও বিশিষ্টজনদের ফোনে আড়িপাতা এবং কথপোকথন রেকর্ড করা।
২) ব্রিগেডিয়ার জিয়াউলের বিরুদ্ধে হাজার খানেক বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ গুম ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে। নিহতরা মূলত সরকার বিরোধিতার কারনে এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
৩) ২০১০ সালের ২৫ জুন বিএনপির ঢাকা মহানগরের প্রভাবশালী নেতা সহসভাপতি ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের রমনা-শাহবাগ এলাকার সাবেক কমিশনার চৌধুরী আলমকে তার বাসার সামনে থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় র্যা ব। এরপর আর তার খোঁজ মিলেনি। শোনা যায় তাকে হত্যা করে মেঘনায় ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে লাশ। ঐ ঘটনার সাথেও জড়িত ছিল লে.কর্নেল জিয়া।
৪) ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীকে কর্নেল জিয়ার নেতৃত্বে গুম করা হয়। অনেকে বলে থাকেন জিয়াউল নিজেই গুলি করে তাকে হত্যা করেছে ঘটনার রাতেই। যদিও হত্যার তথ্যটি প্রমানিত নয়। কারো কারো মতে তাকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
৫) ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল আশুলিয়া থেকে নিখোঁজ হওয়ার পরদিন ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায় গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের। ঐ হত্যার সাথে তিনি জড়িত এমন কথা প্রচার আছে। এ নিয়ে বিস্তর প্রতিবাদ আন্দোলন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রশ্নের মুখে পড়েছিল সরকার, কিন্তু কোনো সঠিক জবাব দিতে পারেনি। পরে একটা নামকা ওয়াস্তে বিচার দেখানো হয়েছে।
৬) ২০১৫ সালের মার্চে বিরোধীদলীয় মুখপাত্র হিসাবে পরিচিত বিএনপির সাবেক মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে তার বাসা হতে র্যা ব অপহরণ করে গুম করে। ঘটনাটি দেশে এবং বিদেশে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং দেশি ও বিদেশী গণমাধ্যমে এটি নিয়ে সংবাদ প্রচার হয়। ঐ গুম ও অপহরণের সাথে জিয়া জড়িত ছিল।
৭) র্যা বের এডিজি হিসাবে কর্নেল জিয়াউল হাসানের নির্দেশ ও শলাপরামর্শেই ২০১৪ সালের এপ্রিলে নারায়ণগঞ্জে সেভেন মার্ডার সংঘঠিত করে র্যা ব-১১ সিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ (আওয়ামীলীগের তৎকালীন ত্রাণমন্ত্রী মায়ার মেয়ের জামাই)। খবরে প্রকাশ, নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর নূর হোসেন ও তার সহযোগীদের কাছ থেকে ৬০ কোটি টাকার বিনিময়ে কাউন্সিলর নজরুলকে অপহরণ করে হত্যা করে র্যা ব কর্মীরা। সেনানিবাসের বাসভবন ‘আশালতা’র নিচে দাঁড়িয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদকে অপারেশনটি করার জন্য শলাপরামর্শ ও নির্দেশ প্রদান করেন কর্নেল জিয়া, এমন খবর তদন্তে উঠে আসে। এমনকি কাউন্সিলর নূর হোসেনকেও হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল, কিন্তু ভারতে পালিয়ে গিয়ে প্রাণে রক্ষা পায়।
৮) ২০১৩ সালের ৫মে শাপলা চত্তরে সংঘটিত গণহত্যার অন্যতম অপারেশন ইনচার্জ ছিলেন র্যা বের পরিচালক লে. কর্নেল জিয়া, টেলিভিশন সাক্ষাতকারে তিনি তা স্বীকার করেছেন। এর কয়দিন পরেই তাকে বিশেষ ব্যবস্থায় কর্নেল পদে পদোন্নতি দেয়া হয়।
৯) ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর লাকসামের বিএনপি সভাপতি সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম হিরু ও লাকসাম শহর বিএনপি সভাপতি হুমায়ুন কবির পারভেজকে মোবাইল ট্র্যাকিং করে আটক করে র্যা ব-১১ সিও লে. কর্নেল তারেক সাইদের টিম দিয়ে হত্যা করা হয়। ঐ ঘটনার সাথেও জড়িত ছিল জিয়া।
১০) সৌদি কূটনীতিক খালাফ আলির খুন, সাংবাদিক জুটি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির হত্যাকান্ডের সাথে তার জড়িত থাকার কথা শোনা যায়।
১১) ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিএনপির ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচি বানচাল করতে এবং ঐ সময়ে বিরোধী দল নিধনের মূল পরিচালক ছিল কর্নেল জিয়া। ঐ সময় কয়েক’শ বিএনপি ও ছাত্রদল নেতাকে অপহরণ করে গুম করা হয়। এদর মধ্যে রয়েছে তেজগাঁও থানা ছাত্রদলের যুগ্মসম্পাদক তরিকুল ইসলাম ঝন্টু, এয়ারপোর্ট থানা ছাত্রদল সেক্রেটারি নিজামউদ্দিন আহমেদ মুন্না, ৩৮ নং ওয়ার্ড বিএনপি সেক্রেটারী সাজেদুল ইসলাম সুমন ও কর্মী তানভীর, বংশাল ছাত্রদল সেক্রেটারি পারভেজ হোসেন, বংশাল থানা ছাত্রদল আহবায়ক মো. জহির, পল্লবী থানা ছাত্রদল জয়েন্ট সেক্রেটারি তরিকুল ইসলাম, সুত্রাপুর স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মাসুদ রানা, তেজগাঁও থানা স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা কাওসার, দারুস সালাম ছাত্রদল ভাইস প্রেসিডেন্ট মফিজুল ইসলাম রাশেদ, তেঁজগাও থানা স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা এ এ ম আদনান চৌধুরি, সুত্রাপুর থানা ছাত্রদল সভাপতি মো. সেলিম রেজা পিন্টু ও জয়েন্ট সেক্রেটারি সম্রাট মোল্লা, নেতা খালেদ হাসান সোহেল, সবুজবাগ থানা ছাত্রদল সভাপতি মাহাবুব হাসান সুজন ও ৫ নং ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি কাজী ফরহাদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল নেতা মাযহারুল ইসলাম রাসেল, আল আমিন, আসাদুজ্জামান রানা, বংশাল থানা ছাত্রদল নেতা মো. চঞ্চল প্রমুখ। এখনও তাদের পরিবার ও স্বজনরা অপেক্ষা করে আছে!
১২) ২০১৪ সালের একদলীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ১২ ডিসেম্বর ২০১৩ মধ্যরাতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জেনারেল এরশাদকে তুলে নিয়ে যায় র্যা বের কর্নেল জিয়া এবং দল, এবং ডিজিএফআই প্রধান মেজর জেনারেল আকবরের সামনে হাজির করে। তাকে ইলেকশনে অংশ নেয়ার জন্য চাপ দেয়া হয়। কিন্তু রাজী না হওয়ায় জেনারেল এরশাদকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। পরে তাকে মাসাধিক কাল সিএমএইচে আটকে রেখে নির্বাচনী নাটক সম্পন্ন করা হয়।
র্যা বে থাকতে জিয়াউল আহসানের গুম ও খুনের কাহিনী নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক লেখালেখি হয়, ফলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকার তারে র্যা ব থেকে সরিয়ে প্রথমে ডিজিএফআইতে বদলী করা হয়, পরে ২০১৬ সালে এনএসআইতে দেয়া হয়, এবং সর্বশেষে ২০১৭ সালে বসানো হয় টেলিফোন আড়িপাতা সংস্খা এনটিএমসির পরিচালক ও পরে মহাপরিচালক হিসাবে।

Leave a Comment

You may also like

Critically acclaimed for the highest standards of professionalism, integrity, and ethical journalism. Ajkerkotha.com, a new-generation multimedia online news portal, disseminates round-the-clock news in Bangla from highly interactive platforms.

Contact us

Copyright 2021- Designed and Developed by Xendekweb